দুই বছর ইন্টার্নশিপের প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ মেডিকেল শিক্ষার্থীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক | র‍্যাপিড পিআর নিউজ.কম

মেডিকেল শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ইন্টার্নশিপের মেয়াদ দুই বছর করার সরকারি প্রস্তাবে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা।

 

গত ২৭ অগাস্ট স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে ‘মেডিকেল কলেজ/ ডেন্টাল কলেজ/প্রতিষ্ঠান এর এমবিবিএস/বিডিএস কোর্সের মেডিকেল শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশীপ প্রশিক্ষণ ও ইন্টার্নশীপ ভাতা প্রদান সংক্রান্ত নীতিমালা-২০১৯’ এর খসড়া প্রকাশ করা হয়।

বর্তমানে পাঁচ বছরের এমবিবিএস কোর্সের পর মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের এক বছর নিজ প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ করতে হয়, নতুন নীতিমালার যা দুই বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

দুই বছরের মধ্যে প্রথম বছরটি শিক্ষার্থীদের নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ করতে হবে। আর দ্বিতীয় বছর কোনো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তাদেরকে যুক্ত করা হবে।  

“প্রথম বছরের প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান দ্বিতীয় বছর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনুশীলন করিবে,” বলা হয়েছে প্রজ্ঞাপনে।

আগামী ১৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ওই খসড়ার ওপর মতামত চাওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে।

সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল (মিটফোর্ড) কলেজের শিক্ষার্থীরা শনিবার ক্যাম্পাসে মিছিল করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও অনেকের মন্তব্যে ক্ষোভের প্রকাশ ঘটছে।

সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নূরুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তারা সরকারের এই সিদ্ধান্ত কখনই মেনে নেবেন না।

“নিয়মিত একজন শিক্ষার্থীর চিকিৎসক হতেই সাড়ে ছয় বছর লেগে যায়। এর সঙ্গে অতিরিক্ত এক বছর যুক্ত হলে লাগবে সাড়ে সাত বছর। ভারতে এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও ওই সময়ের মধ্যে একজন শিক্ষার্থী পোস্ট গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করতে পারে, তাহলে আমরা ভোগান্তি পোহাবো,” প্রশ্ন রাখেন তিনি।

মনিরুজ্জামান বলেন, “এতে শুধু আমাদের চাকরিতে ঢোকাই বিলম্বিত হবে।”

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ইন্টার্নশিপ করার সমস্যা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সরকার প্রয়োজনে আরও বেশি চিকিৎসক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়োগ দিতে পারে। কিন্তু আমাদের সেখানে কাজটা কী? সেখানে আমরা কিভাবে শিখব? কে আমাদের তত্ত্বাবধান করবে?

“মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে আমরা প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশে অ্যাসিসটেন্ট রেজিস্ট্রার, রেজিস্ট্রার, অ্যাসিসটেন্ট প্রফেসর, অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর এবং শীর্ষ প্রফেসরদের কাছ থেকে শিখতে পারি। কিন্তু উপজেলায় (স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে) সে ধরনের পরিবেশ নেই।”

মেডিকেলের এক শিক্ষার্থী  টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদকের মোবাইল ফোনে পাঠানো এসএমএস করেও সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন।

এসএমএসে তিনি লেখেন, “আমাদেরকে সাহায্য করুন, এটা আমাদের ভবিষ্যৎ, পেশাগতজীবন ধ্বংস করে দেবে।”

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সরকার সমর্থক চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) অধ্যাপক ইকবাল আর্সলান সর্তক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

“পরিস্থিতি বিচার-বিবেচনা না করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়,” বলেন তিনি।

আর বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ জানিয়েছেন, সরকারি প্রজ্ঞাপনের বিষয়ে এখনও তারা অবগত নন। 

তিনি বলেন, “মেডিকেলে পাঠ্যক্রম অর্থবা ইন্টার্নশিপ সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত বিএমডিসিই নেয়।

 

 

 

“হ্যাঁ, মন্ত্রণালয়ে কয়েকটি সভা হয়েছে এবং আমাদের প্রতিনিধিরাও সেসব সভায় ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে আমরা সভাগুলোতে মতামতও দিয়েছি। কিন্তু তারা প্রজ্ঞাপন জারি করবে, এমন কোনো ধারণা আমাদের ছিল না।”

দুই বছরের ইন্টর্নশিপ কতটা যৌক্তিক হবে, তা যাচাইয়ে বিএমডিসির পক্ষ থেকে একটি কমিটিরও করা হয়েছিল বলে জানান অধ্যাপক মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ।

“যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ও আমাদের ভেবে দেখতে হবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি (২ বছরের ইন্টার্নশিপ) বাস্তবসম্মত হবে, কি হবে না এবং আমরা যদি তাদেরকে উপজেলায় পাঠাই তাহলে তারা কোথায় থাকবে, কারা তাদেরকে শেখাবে?” 

চিকিৎসকদের নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি অ্যান্ট রাইটস’ এর মহাসচিব শেখ আবদুল্লাহ আল মামুনও সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন।

“এটা হাস্যকর। এতে চিকিৎসক সমাজ এবং জনগণ- উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

তিনি বলেন, “পুরো মেডিকেল শিক্ষা কার্যক্রমের একটি অংশ হচ্ছে ইন্টার্নশিপ। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ। আপনি মেডিকেল থেকে পাসের পরও ইন্টার্নশিপ শেষ না করা পর্যন্ত পুরোপুরি চিকিৎসক হতে পারবেন না। এবং এই প্রশিক্ষণটি  অবশ্যই সুপারভাইজরদের অধীনে সম্পন্ন করতে হয়। সেই সুপারভাইজর আপনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কিভাবে পাবেন।”

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর পরিবেশও তরুণ চিকিৎসকদের থাকার এবং রোগী দেখার মত উপযুক্ত নয় বলেও মনে করেন তিনি।

“বিসিএস এবং বুনিয়াদী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক থাকার পরও সেখানে অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যায়।”

চিকিৎসক শেখ আবদুল্লাহ আরও বলেন, “যে এখনও মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপসহ শিক্ষা জীবন শেষ করতে ছয় বছর লেগে যায়, সেখানে সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে শুধু তাদের (শিক্ষার্থী) শিক্ষাজীবন দীর্ঘই হবে এবং চিকিৎসকদের মধ্যে হতাশা দেখা দেবে।”

বর্তমানে মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের পাঁচ বছরের এমবিবিএস কোর্স সম্পন্ন করার পর বিএমডিসি থেকে সাময়িক লাইসেন্স নিয়ে একবছরের ইন্টার্নশিপ করতে হয়। নিজ নিজ মেডিকেল কলেজের হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ শেষ করার পর সেই লাইসেন্স স্থায়ী হয়।