শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২০, ২৬ আষাঢ় ১৪২৭, সকাল ১০:১৪

প্রচ্ছদ আন্তর্জাতিক চীনের পথ বদলে চিন্তা বাড়ছে ভারতের

চীনের পথ বদলে চিন্তা বাড়ছে ভারতের

ভারতের সঙ্গে ‘আরও ভাল’ এবং ‘অন্য রকম’ সম্পর্ক গড়তে চান বলে গত সাত বছর ধরে বলে আসছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘নতুন অধ্যায়’ গড়ার কথাও বলেছেন অনেকবার। তবে কূটনীতিকেরা এখন মনে করছেন, লাদাখের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় ১৫ জুন রাতের রক্তপাত সেই মোহ থেকে মুক্ত করে ভারত-চীন সম্পর্ককে বাস্তবের জমিতে আছড়ে ফেলেছে।

দু’টি সম্ভাবনাকে পাশাপাশি রেখে শি জিনপিংয়ের বক্তব্য বিচার করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রথমত, প্রাথমিকভাবে চীনা প্রেসিডেন্টের ইচ্ছা ছিল ভারতের সঙ্গে কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে এক নতুন পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে এশিয়ায় একটি শক্তিশালী ব্লক তৈরি করা। পরে তিনি সেই সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসেন। অথবা গোড়া থেকেই সম্মোহিত করার জন্য জাল বিছানো হয়েছিল, যে ফাঁদে পা দিয়ে নরেন্দ্র মোদি সরকারও বারবার রেড কার্পেট পেতেছে শি জিনপিংয়ের জন্য।

চীনে নিযুক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত গৌতম বাম্বাওয়াল বলেন, আমরা আশা করেছিলাম, দু’দেশের মধ্যে শান্তির পরিবেশ তৈরি হবে। যার প্রতিফলন পড়বে সীমান্তে। আর সীমান্ত ঠান্ডা থাকলে বাণিজ্য, পর্যটন সবই বাড়বে।

নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার যুক্তি, চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক ভারতের জন্য বিশাল লাভজনক। তাই বারবার আছাড় খেয়েও বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছে দিল্লি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি প্রথম যে বিদেশি রাষ্ট্রনেতার সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন, তিনি শি জিনপিং। চীনা প্রেসিডেন্ট ভারতে থাকাকালীনই লাদাখে দুই দেশের সেনাবাহিনীর সংঘর্ষ হয়। মোদির কাছে জিনপিং দুঃখপ্রকাশ করে বলেছিলেন, সেনাবাহিনীর কিছু ‘পচা অংশ’ তার সফরকে ভেস্তে দিতে এ কাজ করেছে। তিনি দেশে ফেরার পরে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

সেদিন শি-র সৌজন্যে মুগ্ধ হয়েছিল নয়াদিল্লি। পরে পরমাণু জ্বালানি সরবরাহকারী গোষ্ঠীতে (এনএসজি) ঢোকার প্রশ্নে নয়াদিল্লিকে আটকে কিংবা প্রতিবেশী দেশগুলোতে প্রভাব খাটিয়ে ভারতের ওপর চাপ বাড়িয়েছে চীন। জিনপিং বলে আসছেন, সম্পর্কের উন্নতিই তার লক্ষ্য। মোদির সঙ্গে তিনি অন্তত এক ডজন বৈঠক করেছিলেন।

ভারতীয় কূটনীতিকরা মনে করেন, মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীনই নয়াদিল্লির সঙ্গে সুসম্পর্কের বার্তা দিতে শুরু করেছিলেন চীনা প্রেসিডেন্ট। ২০১৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্রিকস সম্মেলনের সময়ে তিনি আলাদাভাবে বৈঠক করেন মনমোহনের সঙ্গে। পরের বছর মোদি ক্ষমতায় আসার পর বেইজিংয়ে নিযুক্ত হতে চলা ভারতীয় রাষ্ট্রদূত অশোক কান্তাকে ডেকে শি জিনপিং বলেন, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতি তার কাছে ঐতিহাসিক মিশন।

কান্তার কথায়, তখন থেকেই ব্যক্তিগতভাবে ভারতনীতি নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন শি। যা চীনের রাজনীতিতে অভিনব। ওই সময় চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত সফরে এলে তাকে শি-র বিশেষ দূত হিসেবেই তুলে ধরেছিল বেইজিং।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাংশের ধারণা- ভারতের প্রতি চীনা প্রেসিডেন্টের এই ‘অতি মুগ্ধতা’ ভালোভাবে নেয়নি চীনের সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা বিভাগ। কারণ, ভারত-বিরোধিতা লালফৌজের ডিএনএ-তে। প্রকল্পে আপত্তি, আমেরিকার সঙ্গে সখ্য, কোয়াড বা চীন-বিরোধী চতুর্দেশীয় অক্ষ তৈরিতে নয়াদিল্লির সিদ্ধান্তগুলো সামনে এনে ভারতবিরোধিতার ঠান্ডা কৌশল তৈরি হয় চীনা কমিউনিস্ট পার্টিতে— শেষ পর্যন্ত যাতে সামিল হন প্রেসিডেন্টও।

তবে আপাতত একটি বিষয় স্পষ্ট। দীর্ঘ দিন ধরে চলা নরম-গরম নীতি এবং উহানের নৌকাবিহার থেকে শুরু করে মল্লপুরমের দীর্ঘ সংলাপের মতো দু’দেশের সম্পর্কের নানা পরীক্ষানিরীক্ষা দু’তরফ থেকেই আপাতত বন্ধ করে দিয়েছে ১৫ জুনের অভিশপ্ত রাত। আনন্দবাজার।

মন্তব্য করুন:

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন

সর্বাধিক পঠিত