spot_img
spot_img

মঙ্গলবার, ৩০ নভেম্বর ২০২১, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, সকাল ৬:১২

প্রচ্ছদঅন্যান্যপহেলা বৈশাখের প্রস্তুতি ॥ ফ্যাশন হাউস ও শোরুমে নতুন পণ্য

পহেলা বৈশাখের প্রস্তুতি ॥ ফ্যাশন হাউস ও শোরুমে নতুন পণ্য

পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন উৎসবপ্রিয় জাতি। ফ্যাশন হাউস ও শোরুমগুলো ভরে ওঠছে নতুন পণ্যসামগ্রীতে। শুরু হয়েছে কেনাকাটা। বৈশাখ মাস সামনে রেখে মার্চ মাসের বেতনের সঙ্গে এবার উৎসব ভাতা পাবেন সরকারী কর্মকর্তারা। বেসরকারী খাতের অনেক প্রতিষ্ঠানে উৎসব ভাতা দেয়া শুরু হয়েছে। কেনাকাটা বাড়াতে বিশেষ ছাড় দিয়ে ক্রেতা আকর্ষণের চেষ্টা করছেন ব্যবসায়ীরা। বৈশাখী বেচাবিক্রিতে ক্ষুদ্র-মাঝারি মানের শিল্পখাতে সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। উদ্যোক্তারা আশা করছেন, এপ্রিলের শুরুতেই বেচাকেনা জমে উঠবে। 

জানা গেছে, মার্চ মাসের বেতনের সঙ্গে এবার প্রায় ৭শ’ কোটি টাকার উৎসব ভাতা পাবেন দেশের সরকারী চাকরিজীবীরা। উৎসবকেন্দ্রিক অর্থনীতির ব্যাপ্তি ছড়িয়ে দিতে সরকারীভাবে ছয়টি ঋতুতে ছয়টি উৎসব পালনের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। শুধু চারুকলার বকুলতলায় সীমাবদ্ধ না রেখে নবান্ন ও পৌষ উৎসবও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য বেসরকারী খাতকে সম্পৃক্ত করা হতে পারে। আগামী বাজেটে এ সংক্রান্ত একটি ঘোষণা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সম্প্রতি এলডিসি সংক্রান্ত একটি বৈঠক শেষে জানিয়েছেন, বাঙালী উৎসবপ্রিয় জাতি। যে কোন আনন্দ এবং অর্জনে এদেশের মানুষ উৎসব করে থাকে। সর্বজনীন উৎসব হিসেবে পহেলা বৈশাখের ব্যাপ্তি ছড়িয়ে দিতে উৎসব ভাতা দেয়া শুরু করেছে বর্তমান সরকার।

প্রসঙ্গত, অষ্টম পে স্কেলে দেশে প্রথম বারের মতো বাংলা নববর্ষে মূল বেতনের সঙ্গে ২০ শতাংশ উৎসব ভাতা দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সরকার। এবার তৃতীয় বারের মতো সরকারী চাকরিজীবীরা উৎসব ভাতা পেতে যাচ্ছেন। সরকারের এই সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে দেশের বেসরকারী খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান অনুসরণ করে উৎসব ভাতা প্রদান করছে। জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃতি পাওয়ায় পহেলা বৈশাখে চারুকলার মঙ্গলযাত্রা এখন বিশ্ব ঐহিত্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের প্রগতিশীল, মুক্তচিন্তা এবং সংস্কৃতিমনা মানুষ জাতিসংঘের এই স্বীকৃতিকে অনেক বড় অর্জন বলে মনে করছেন। তাঁরা বলছেন, পহেলা বৈশাখের মতো ছয়টি ঋতুতেই বাংলাদেশে ছয়টি উৎসব হতে পারে। ইতোমধ্যে সর্বজনীন এই উৎসব ঘিরে সারাদেশে শুরু হয়েছে বৈশাখী কেনাকাটা। মার্কেট, বিপনিবিতান, শপিংমল ও ফ্যাশন হাউসগুলো বর্ণিল সাজে সাজতে শুরু করেছে।

জানা গেছে, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা এবং বাঙালীর মূল শেকড় বাঁচিয়ে রাখতে সব ধরনের উৎসব-পার্বণে সরকারী সহযোগিতা বৃদ্ধি করা হবে। আর এ কারণেই সরকারী কর্মকর্তাদের বৈশাখী ভাতা প্রদান করে এই উৎসবকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা দেয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক উর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, উৎসব পার্বণের বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ সর্বজনীন উৎসব হিসেবে উদ্যাপিত হয়ে আসছে। এই উৎসবটি উদ্যাপনে সরকারী চাকরিজীবীরা ভাতা পাচ্ছেন। বেসরকারী খাতকেও এ ব্যাপারে উৎসাহিত করা হচ্ছে। বাঙালীর সর্বজনীন এই উৎসব বাংলাদেশের বাইরেও উদ্যাপন করা হয়। এই উৎসবের পাশাপাশি নবান্ন এবং পৌষ উৎসব সরকারীভাবে উদ্যাপন করা যায় কিনা সে বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে। আগামী বাজেটে এ সংক্রান্ত দিকনিদের্শনা দেয়া হতে পারে।

 
তিনি বলেন, স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এবার সারাদেশে উৎসব করা হয়েছে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারী খাত এবং সর্বস্তরের মানুষ এই উৎসবে শামিল হয়েছেন। এটা থেকে প্রমাণিত হয় যে কোন অর্জন এবং উৎসবে বাঙালীদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণের নজির রয়েছে। এদিকে, ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে বাঙালী জাতির এটিই সবচেয়ে বড় উৎসব। বাঙালীর সর্বজনীন এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বাড়ছে ব্যবসা ও বাণিজ্য। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র শুরু হয়েছে নানামুখী অর্থনৈতিক কর্মকা-। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ায় পহেলা বৈশাখে অর্থনীতির গতি বাড়ে। এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি মনোয়ারা হাকিম আলী জনকণ্ঠকে বলেন, ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায় গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ পালিত হয়ে আসছে। সরকারী কর্মকর্তারা উৎসবভাতা পাওয়ায় বৈশাখ কেন্দ্রিক অর্থনীতির পরিধি সম্প্রাসারণ হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশে নারী উদ্যোক্তারা বৈশাখকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি যুক্ত হচ্ছেন। কারণ এই সময়টাতে সবচেয়ে বেশি শাড়ি, ফতুয়া, কামিজসহ বিভিন্ন পোশাকসামগ্রী বিক্রি হয়ে থাকে। তিনি বলেন, বৈশাখ সামনে রেখে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের নারী উদ্যোক্তারা বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছেন। সবাই যাতে দেশী পোশাক কেনাকাটা করে সেই দিকটায় সবার নজর থাকা উচিত। দেশের বিত্তশালীরা এখন যে কোন উৎসবে দেশের বাইরে কেনাকাটা করেন। এটা না করে;বরং পহেলা বৈশাখে অন্তত দেশী পোশাক ব্যবহার করা উচিত। এতে অভ্যন্তরীণ শিল্প বিকাশ হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

এদিকে, বৈশাখের অন্যতম বড় দিক হচ্ছে-নতুন পোশাক। নিজস্ব ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলিয়ে ফ্যাশন হাউসগুলো তৈরি করছে বাহারি সব পোশাক-আশাক। নানা রকমের সুতি শাড়ি, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, টি-শার্টসহ বিভিন্ন ধরনের পোশাকে ভরে উঠছে সারদেশের পোশাক হাউসগুলো। নারী-পুরুষ ভেদে পোশাকের কদর বেড়ে যায় সর্বত্র। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্য মতে, রাজধানীসহ সারাদেশে প্রায় সাড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার বুটিক ও ফ্যাশন হাউস রয়েছে। ঢাকার কেরানীগঞ্জ, সদরঘাট, জিঞ্জিরা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় তৈরি হচ্ছে বৈশাখী পোশাক। এসব পোশাক এখন শোভা পাচ্ছে রাজধানীসহ সারা দেশের ফ্যাশন হাউসগুলোয়।

বিক্রেতারা বলছেন, ঢাকায় বৈশাখ ঘিরে মার্কেট জমে ওঠে। তাছাড়া প্রতিবছরই ঢাকার বাইরে প্রচুর পরিমাণ পোশাক বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস থেকে নেয়া হয়। পুরান ঢাকা র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিটের আড়ংয়ের বিক্রয়কর্মী ঈশিতা জানালেন, বৈশাখ ঘিরে বাহারি সব শাড়ি, পাঞ্জাবি, ফতুয়া ও টি শার্ট আনা হয়েছে। এগুলোর বিক্রিও ভাল হচ্ছে। একই কথা বললেন, র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিটের কে-ক্রাফটের বিক্রেতা নাজমুল হোসেন। তিনি বলেন, বৈশাখ উৎসব ঘিরে তাদের পোশাকে ডিজাইন ও রঙে বৈচিত্র্য আনা হয়েছে। ধীরে ধীরে ক্রেতা বাড়ছে। বৈশাখের আগে তাদের সব পোশাক বিক্রি হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করলেন।

 
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ঢাকার বেইলি রোড, আজিজ মার্কেট, গাউসিয়া মার্কেট, বসুন্ধরা ও যমুনা ফিউচার পার্কসহ সর্বত্র বৈশাখী পোশাকের ছড়াছড়ি। পোশাকের পাশাপাশি এই উৎসবে বিক্রি হবে মাটির বাসন, মাটির গহনা থেকে সোনার গহনা। মুরালি, চিড়া, দই ও পোলাওয়ের চাল ও মাংসের চাহিদা রয়েছে। গেঞ্জি ফতুয়া থেকে শাড়ি এবং বাঁশের বাঁশি থেকে স্টিল আলমারি, খাট বিছানার চাদর থেকে পর্দা ও ফ্লোর কার্পেট সব বিক্রি হবে এই উৎসবে। বিক্রি হবে টিভি ও ফ্রিজ। তাই সব পণ্যের দোকানে এখন ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে। এই ভিড় সর্বজনীন। জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সব শ্রেণীর ক্রেতা দোকানে দোকানে নতুন পণ্যের খোঁজ করছেন। বিক্রি বাড়াতে ফার্নিচার, ইলেকট্রনিক্স ও পোশাকের দোকানে বিশেষ লোভনীয় ছাড় দেয়া হয়েছে। বাড়ছে কেনাকাটা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এস কাদের চৌধুরী কিরণ বলেন, সর্বজনীন এই উৎসবে আগে কেনাকাটা বাড়ে। চাকরিজীবীরা মার্চ মাসের বেতন ও ভাতা হাতে পাওয়ার পর কেনাকাটা করতে মার্কেটে আসবেন। বৈশাখ সামনে রেখে ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতি ভাল। আশা করছি, ভাল ব্যবসা-বাণিজ্য হবে। তিনি বলেন, রোজার ঈদ সামনে রেখে এখন ঈদের প্রস্তুতিও রয়েছে ব্যবসায়ীদের। কারিগররা ঈদের পোশাক-আশাক বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। সরকারী কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম  বলেন, আগামী দু’একদিনের মধ্যে মার্চ মাসের বেতনের টাকা ব্যাংকে জমা হবে। ওই সময়ে উৎসব ভাতার টাকাও জমা হবে বলে শুনেছি। তাই সপ্তাহের শুরুতেই বৈশাখী কেনাকাটা করতে পারব বলে আশা করছি। বাংলা নববর্ষ সামনে রেখে পর্যটন এলাকা বিশেষ করে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার, সিলেট ও কুয়াকাটায় বিপুলসংখ্যক পর্যটক ছুটে যাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে পর্যটন এলাকার হোটেল মোটেল রেস্তোরাঁসহ সব ধরনের ব্যবসায়ীরাই বৈশাখ উদ্যাপনে সেবার পরিধি বাড়াতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

মন্তব্য করুন:

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বাধিক পঠিত