spot_img
spot_img

রবিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২২, ৯ মাঘ ১৪২৮, সকাল ৬:০৭

প্রচ্ছদফুটবলকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখি : নুরুজ্জামান নয়ন
Array

ফুটবলকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখি : নুরুজ্জামান নয়ন

আশির দশকেও বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে স্বপ্ন দেখার মানুষের অভাব ছিল না। অন্তত দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে ছিল না কোনো প্রশ্ন। কিন্তু হঠাৎ কী যেন হলো, গতি হারিয়েছে বাংলাদেশ ফুটবল। র‌্যাংকিং এ বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ১৯২। ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’-এ লাল-সবুজের পতাকা কখনো কি উড়বে? বিশ্বকাপ এলে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি, ইতালি, স্পেনের পতাকার বদলে বাংলার আকাশে প্রতাপ নিয়ে কখনো কি উড়বে না ৩০ লাখ মানুষের রক্তে ভেজা পতাকা?    বাংলাদেশ ফুটবল এর অবস্থান, এথেকে উত্তরণের পথ নিয়ে ভাবনা, দর্শকদের  করণীয়, ফুটবলার এর মান, কোচিং, ফুটবল জগতের বিভিন্ন দিক নিয়ে একান্ত সাক্ষাৎকারে কথা বলেন  বাংলাদেশের সফল ফুটবল কোচ নুরুজ্জামান নয়ন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন র‌্যাপিড পিআর নিউজ এর যুগ্ম সম্পাদক সাজিম মাহমুদ।   ফুটবলার থেকে ফুটবল কোচ….. ছোটবেলায় স্বপ্ন ছিল বড় ফুটবলার হবেন। তখনকার সেরা ক্লাব আবাহনী বা মোহামেডানের হয়ে খেলবেন। বড় ফুটবল তারকা হওয়ার এই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। কিন্তু তাঁর হাত ধরেই এখন তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের অনেক ফুটবল তারকা।   একজন কোচের সাফল্যের মাপকাঠি যদি হয় তার ক্লাবের সাফল্য, তাহলে নিঃসন্দেহে নুরুজ্জামান নয়ন এই মূহুর্তে বাংলাদেশের সফল ফুটবল কোচদের একজন। ঢাকার প্রথম সারির বেশ কয়েকটি ফুটবল ক্লাবে খেলেছেন খেলোয়াড় হিসেবে । এর মধ্যে আছে শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র, ধানমন্ডি ক্লাব, ঢাকা সিটি ক্লাব এবং ভিক্টোরিয়া স্পোটিং ক্লাব।   বর্তমানে তিনি চট্রগ্রাম আবাহনী লিমিটেড ক্লাব এর গোলকিপার কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে ১৪ ম্যাচে মাত্র ৪ গোল হজম করে ২০১৭ বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগে পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে চট্রগ্রাম আবাহনী। সবচেয়ে  বেশী ম্যাচে সবচেয়ে কম গোল, বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগের ইতিহাসে এটা একটা রেকর্ডও বটে!   এর আগে ২০১১-২০১২ সালে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের গোলকিপার কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৩ সালে ঢাকা আবাহনী লিমিটেড নারী ফুটবল দলের হেড কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ঢাকা মোহামেডানকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় তাঁর ক্লাব।২০১৪-২০১৫ সালে ঢাকা মোহামেডান এর গোলকিপার কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ফেডারেশন কাপ চ্যাম্পিয়ন হয় ঢাকা মোহামেডান। ২০১৫-২০১৬ সালে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের গোলকিপার কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।    বাংলাদেশে নুরুজ্জামান নয়ন হচ্ছেন প্রথম এএফসি লেভেল ১ (গোলকিপিং কোচ)লাইসেন্সপ্রাপ্ত কোচ। নেপালের কাঠমুন্ডুতে অনুষ্ঠিত এই প্রশিক্ষণে প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি।এছাড়াও  এএফসি সি (ইরান) এবং এএফসি বি (ভূটান) লাইসেন্সপ্রাপ্ত কোচ তিনি।   একটা সময়ে আমাদের ক্লাব ফুটবলের যে জনপ্রিয়তা ছিলো, সেটা এখন একেবারেই নেই বলা যায়….. এই ব্যাপারটা আমি একটু ভিন্নভাবে বলতে চাই। খেলাধূলাটাই আমাদের বিনোদনের মাধ্যম ছিলো, আমরা শুধু বিটিভি দেখতাম। সময়ের পরিবর্তে এখন টিভি খুললেই সারা পৃথিবীর খেলা দেখতে পারছি। বার্সালোনা – রিয়াল মাদ্রিদ নিয়ে এতো উত্তেজনা, সেটাতো হচ্ছে। আর আমাদের কথা যদি বলেন তাহলে এশিয়াতে না হলেও সাফ ফুটবলে আমরা ভালো পজিশনেই ছিলাম। জনপ্রিয়তাটা আসলে কমে গেছে কেনো? ফাইনান্সিয়াল কারণে মোহামেডান-আবাহনী মতো ক্লাবও ভালো দল গড়তে পারছে না। প্রতিযোগীতা বেড়েছে, এখন আরো নতুন নতুন ক্লাব এসেছে শেখ জামাল আছে, শেখ রাসেল আছে, মুক্তিযোদ্ধা আছে আরও অন্যান্য অনেক দল। মোহামেডান -আবাহনী তাদের জৌলুস হারিয়েছে। এক সময় নাইজেরিয়া, রাশিয়া, ইরান এসব দেশের জাতীয় দলের বিখ্যাত খেলোয়াড়রা এখানকার ক্লাবগুলোতে খেলে গেছে। মোহামেডান একবার এশিয়ান ক্লাব কাপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। বর্তমানে এমন অর্জনের কথা ভাবা একটু দুস্কর-ই বটে।   আর দর্শকদের কথা যদি বলেন – বিনোদনের মাধ্যম ছিলো ফুটবল। আমরা এক সপ্তাহ আগে থেকেই জল্পনা কল্পনা শুরু করে দিতাম কার ফ্ল্যাগ কতো বড়ো হয় সেটা নিয়ে প্রতিযোগীতা হতো। এখন হয় কি? বাংলাদেশের ফুটবলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে ফলাফল সে কারণে কিন্তু দর্শক মাঠে যাচ্ছে না। ফুটবলের জনপ্রিয়তা কমে গেছে সেটা বলবো না, ক্রেজটাও আছে ফুটবলের জন্য, মানুষ এখনো পাগল। রেজাল্ট না থাকায় দর্শক উপস্থিতি কমে গেছে, বিশেষ করে ঢাকা স্টেডিয়ামে।  বাফুফের কর্মকর্তা যারা আছেন উনাদের ভাবতে হবে বাংলাদেশের ফুটবল কোথায় যাচ্ছে , বাংলাদেশের মানুষ কি চায়। চাওয়া পাওয়ার মাঝে প্রাপ্তি আর প্রত্যাশার মাঝে সমন্বয় না করতে পারলে কাঙ্খিত ফলাফল কখনোই আসবে না।   বাংলাদেশ ফুটবলের এই বিপরীতমুখি গতি কেন? এটা দুঃখজনক যে ফুটবলে আমাদের সেই মানটি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। এখন অনেক জায়গায় লীগ হয় না। লীগ না হওয়ার কারণে সম্ভাবনাময় তরুণ খেলোয়াড়দের আমরা বের করে আনতে পারছি না। বিশ্বকাপে আমরা অনেক দেশ দেখি যাদের জনসংখ্যা ঢাকা শহরের জনসংখ্যার চাইতেও কম, কিন্তু তারপরও তারা সুন্দর দল তৈরি করেছে, কিন্তু আমাদের এত জনসংখ্যা থাকার পরও আমরা দল তৈরি করতে পারছি না।   ফুটবলের মান উন্নয়নে কি করা যেতে পারে? বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণে ট্যালেন্টেড ফুটবলার আছে, তাঁদের সঠিক পরিচর্যা দিয়ে মূল্যায়ন করা হয় তাহলে অবশ্যই ভালো করবে। কথার প্রসঙ্গে আরেকটা কথা বলি, আমাদের ফুটবলের যে স্ট্রাকচার সেটা এখনো আমরা সঠিকভাবে শুরু করতেই পারিনি আমি মনে করি। ফুটবলটা হয়ে গেছে ঢাকা কেন্দ্রিক ফুটবল এমন একটা খেলা যেটা সারা বাংলাদেশের হওয়া উচিৎ। প্রত্যেকটি জেলা, উপজেলায় ঘরোয়া ফুটবলটা নিয়মিত হলে খেলোয়াড় সংকটটা কেটে যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি।   আর একটা কাজ করা যেতে পারে, আমরা আসলে একটা দীর্ঘ পরিকল্পনা করতে পারি, সেটা পাঁচ বছরের একটা পরিকল্পনা হতে পারে। জেলাভিত্তিক লীগগুলো নিয়মিত হলে সেখান থেকে ভালো ফুটবলারদের বাছাই করে এনে দল গড়ার জন্য যা যা করা দরকার তা করা উচিৎ, এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া হওয়া উচিৎ।  স্কুল লেভেলে অনূর্ধ ১০/১২ বছর বয়সী ছেলেদের থেকে আমরা যদি খেলোয়াড় বাছাই করতে পারি এবং তাদের সাত আট বছর সঠিক ট্রেনিং দিতে পারি তাহলে সেখান থেকে খুব ভালো একটা দল বের হয়ে আসবে বলেই আমার বিশ্বাস। তাছাড়া বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো প্রতিষ্ঠান বা তার সহ-প্রতিষ্ঠান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিয়ে সেখান থেকেও ভালো খেলোয়াড় প্রস্তুত করা সম্ভব। এতে ফুটবলারদের সংখ্যা অনেকাংশে বেড়ে যাবে এবং সংকট অনেকাংশে কেটে যাবে।   বাংলাদেশের কোচিং মান….. বাংলাদেশে যদি ফুটবলের মান বাড়াতে হয়, তাহলে আগে তাদেরকে ভালো ফুটবল কোচ তৈরির দিকে মনোযোগ দিতে হবে বলে মনে করেন নুরুজ্জামান নয়ন। 'বাংলাদেশের কোচরা যেসব প্রশিক্ষণ নেন, সেগুলোর মডিউল বহু পুরোনো। নব্বুই দশকের পর আর এগুলো আপডেট করা হয়নি। অথচ বিশ্ব ফুটবলের কলা কৌশল কত পাল্টে গেছে। এর পাশাপাশি একেবারে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত ফুটবল একাডেমী করে সেখান থেকে ফুটবল প্রতিভা খুঁজে বের করার ওপর জোর দেন তিনি।   'ক্রিকেটে আমাদের কিন্তু এখন একেবারে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত এরকম একাডেমী আছে। সেখানে আট-নয় বছর বয়স থেকে ছেলেরা প্রশিক্ষণে যাচ্ছে। ফুটবলে প্রতিভা খুঁজে বের করতে একই ধরণের অবকাঠামো গড়ে তোলা দরকার'। তৃণমূল পর্যায়ে এরকম একাডেমী গড়ে তুললে বাংলাদেশে ফুটবল প্রতিভার অভাব হবে না বলে মনে করেন তিনি।   র‌্যাপিড  পিআর পাঠকদের উদ্দেশ্য কিছু বলবেন?  আমি, আমাদের যারা ফুটবল ভক্ত আছে তাঁদের উদ্দেশ্য করে বলতে চাই ফুটবল এমন একটি খেলা সারা বিশ্বের মানুষ পছন্দ করে। আমরা যারা বার্সালোনা কিংবা রিয়াল মাদ্রিদের সমর্থন করছি, হয়তো মেসি – রোনালদোর কারনে বিদেশী দলগুলোর জন্য ফ্যানবেজ তৈরী হয়েছে। আমি মনে করি তাঁর আগে বাংলাদেশের দলগুলোকে সাপোর্ট করা উচিৎ। বাংলাদেশের ক্লাবগুলোকে নিয়ে যদি তাঁদের এই আগ্রহটা থাকে, ফ্যানবেজ গড়ে উঠে তাহলে সেটা আমার বাংলাদেশের ফুটবল এর জন্য অনেক বেশী ইতিবাচক। অবশ্যই বিদেশী দল সমর্থন করবে তবে তাঁর আগে বাংলাদেশ এর ক্লাবগুলোর দিকে নজর দেয়া উচিৎ। দেশে পরিপূর্ন স্পোর্টস কালচার গড়ে উঠতে সাহায্য করা উচিৎ। বাংলাদেশের ফুটবলকে ভালোবাসা উচিৎ।   বাংলাদেশ ফুটবল নিয়ে ভাবনাগুলো শুধুমাত্র ফেসবুকে না থেকে, দৃশ্যমান করতে হবে। আমরা আমাদের ফুটবলকে ভালোবাসি এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই ফুটবলকে এই ভাবনাটা দৃশ্যমান হওয়া উচিৎ। সমস্যাগুলো কি সেগুলো নিয়ে তারা কি ভাবছে তা বাফুফের কাছে চিঠি লিখে জানানো যায়। বাফুফে এবং ক্লাবগুলোর মাঝে খেলোয়াড় নিয়ে যে টানাপোড়ন এই ইস্যুগুলো নিয়ে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে তাঁদের মনোভাব বাফুফেকে জানানো উচিৎ। বিষয়গুলো দৃশ্যমান হতে হবে শুধু ফেসবুকে বিষয়টা যথেষ্ট হচ্ছে না। ফেসবুক গ্রুপ গুলো থেকে ফ্যানবেজ তৈরী করা সম্ভব। ক্লাবগুলোর সাথে সম্পর্ক করা উচিৎ, তাহলে তারা বুঝতে পারবে বাংলাদেশ ফুটবলের জন্য দর্শক হিসেবে ফুটবল প্রেমী হিসেবে ভূমিকাটা কি হতে পারে।   র‌্যাপিড  পিআর  এত ব্যস্ততার পরও আমাদেরকে সময় দেওয়ার জন্য অশেষ ধন্যবাদ।   নুরুজ্জামান নয়ন  আপনারদেরকে ও অশেষ ধন্যবাদ। র‌্যাপিড পিআর এর পাঠকদের ধন্যবাদ ও শুভকামনা।   

মন্তব্য করুন:

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বাধিক পঠিত