spot_img
spot_img

সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, রাত ২:২২

প্রচ্ছদদেশেই কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট হচ্ছে শিশুদের
Array

দেশেই কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট হচ্ছে শিশুদের

 কিডনি চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং দেশের বাইরে ছাড়া এই চিকিৎসা সম্ভব নয়—এমন ধারণা ভুল প্রমাণ করে শিশুদের কিডনি চিকিৎসায় সাফল্য দেখিয়েছেন দেশের চিকিৎসকরা। ইতোমধ্যে ১১ শিশুর কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট বা প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)-এর পেডিয়াট্রিক নেফ্রোলজি বিভাগে শিশুদের কিডনি চিকিৎসা চলছে। নেফ্রোলজি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এখান থেকে কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করা ১১ শিশুর মধ্যে ১০ জনই সুস্থ আছে এবং প্রথম যে শিশুর কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করা হয়েছিল সে এখন ব্যবসায়ী এবং বিবাহিত। সুস্থ জীবনযাপন করছেন তারা সবাই। 

কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের ব্যাপারে বিএসএমএমইউ’র পেডিয়াট্রিক নেফ্রোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবুর রহমান জানান, মোট তিনজন মেয়ে শিশু এবং আটজন ছেলে শিশুর কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করা হয়েছে। তাদের ৯ জনের ডোনার ছিল মা ও দুজনের ডেনার ছিল বাবা। ছেলে শিশুদের কিডনি রোগের প্রকোপ মেয়ে শিশুদের তুলনায় বেশি। তাই কিডনি বিকল হওয়ার হারও ছেলে শিশুদের বেশি।

সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা বলছেন, শিশুদের কিডনি চিকিৎসায় বাংলাদেশ এখন অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে। তবে কিডনি চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ওষুধ দেশেই উৎপাদন করা গেলে এই রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা ব্যয় আরও কমবে।

অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় যখন প্রতিষ্ঠিত হয়নি তখন এখানে শুধু পেরিটনিয়াল ডায়ালাইসিসের মাধ্যমে কিডনি বিকল রোগের চিকিৎসা হতো। ১৯৯৮ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে এই চিকিৎসার উন্নতি হতে থাকে। ২০০৫ সালে শিশুদের কিডনি চিকিৎসার জন্য আলাদা একটি বিভাগ চালু হয়। এখন এই বিভাগের ইনডোরে ২৪টি বেড ও ৩টি হিমোডায়ালাইসিসের বেড রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘এখন কিডনি আক্রান্ত রোগীরা দুই শিফটে এখান থেকে ডায়ালাইসিসের সেবা নিচ্ছে। শুরুতে একজন অধ্যাপক, একজন সহযোগী অধ্যাপক ও একজন সহকারী অধ্যাপক দিয়ে এই বিভাগ চালু করা হয়। বর্তমানে ৭ জন শিক্ষক ও ৯ জন নার্সিং স্টাফ এই বিভাগে রয়েছেন। এই বিভাগের অধীনে  এমডি ও এফসিপিএস কোর্সের মতো উচ্চতর ডিগ্রি চালু রয়েছে। পাঁচ বছর কোর্স শেষের পর এমডি ডিগ্রি প্রদান করা হয়। বর্তমানে ১২ জন ছাত্রছাত্রী এমডি কোর্সের ফেইজ-বি’তে অধ্যয়নরত।’

এ রোগের লক্ষণ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, জন্মগতভাবে শিশুদের কিডনি রোগ হয়, আবার মূত্রনালীতে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ছেলেদের মূত্রনালীতে পর্দার মতো হয়, যার কারণে সারাক্ষণ প্রস্রাব ঝরতে থাকে। এছাড়াও শরীর ফুলে যায়। শরীর ফ্যাকাসে হয়ে পড়ে। এসব কারণে সাধারণত কিডনি রোগে আক্রান্ত শিশুরা আমাদের কাছে আসে। আবার ডায়রিয়ার কারণেও কিডনি বিকল হয়ে যায়।’ কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডায়ালাইসিস করলে শিশু ভালো হয়ে যায় এবং কিছু ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা হচ্ছে কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট বা প্রতিস্থাপন করা।

চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, ‘শিশুর কিডনি বিকল হলে তা সারানোর চিকিৎসা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি। যদি তার উচ্চ রক্তচাপ থাকে তাহলে তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত গেলে বা শ্বাসকষ্ট হলে তা দূর করতে হবে। শরীরে লবণের পরিমাণ বেড়ে গেলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। রোগীকে নিয়মিত ফলোআপে থাকতে হবে।’

এ ব্যাপারে সহযোগী অধ্যাপক ডা. আফরোজা বেগম বলেন, ‘আমাদের দেশের যারা চিকিৎসার জন্য বাইরে যান, তাদের চিকিৎসকরা বলে দেন কেন আপনারা বাইরে এসেছেন? আপনাদের দেশেই তো ভালো চিকিৎসক আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাইরের চিকিৎসকরা আমাদের চেনেন। আমাদের বিভিন্ন কনফারেন্স হয়। তখন আমাদের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের চিকিৎসকদের মতবিনিময় হয়। আমরা একে অন্যের সঙ্গে চিকিৎসাসেবা নিয়ে কথা বলি।’

ডা. আফরোজা বেগম বলেন, ‘কিডনি রোগের রোগী বাড়ছে। কারণ, কিডনী রোগ ডায়াগনোসিস হচ্ছে, আগে হয়তো রোগ নির্ণয়ই হতো না। রোগী মারা যেত। এখন রোগীর রোগটা নির্ণয় হচ্ছে। গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে চিকিৎসকরাও আমাদের কাছে রোগী পাঠাচ্ছেন। খাবারে ভেজাল, দূষণ এসবের কারণে কিডনির ওপর চাপ বাড়ছে, কিডনি রোগ বাড়ছে।’

আমাদের দেশে কিডনির চিকিৎসার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে কম খরচে চিকিৎসা করা হয়। বেশিরভাগ রোগীর জন্য হাসপাতাল থেকে সহযোগিতা করা হয়। স্বল্প আয়ের রোগীদের আমরা নিজেরাও কিছু আর্থিক সহায়তা করি। মোটামুটি মধ্যবিত্তরা চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে পারেন। চিকিৎসা বন্ধ থাকে না। কোনও রোগী চিকিৎসা না নিয়ে ফেরত যায় না।’

সহযোগী অধ্যাপক ডা. সৈয়দ সায়মুল হক বলেন, ‘শিশু জন্মের আগেই আল্ট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে কিছু কিডনি রোগ শনাক্ত করা যায়। জন্মের পরপরই যদি সেই শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে সে শতভাগ সুস্থ হয়ে উঠতে পারে। শিশুদের প্রস্রাবে সমস্যা, ডায়রিয়ার সমস্যা হলে সেখান থেকে কিডনি বিকলের ঝুঁকি থাকে। সেগুলো দূর করতে পারলে কিডনি নিরাপদ থাকে। অনেক শিশু কিডনির সমস্যার কারণে প্রাকৃতিক কাজ সারতে পারে না। আমরা সেটা ঠিক করে দিলে সে ভালো হয়ে যায়। এখন অনেক শিশুকে ডায়াপার পরানো হচ্ছে। সেক্ষেত্রে ডায়াপার ভিজে যাওয়ার পরপরই তা যেন বদলে ফেলা হয় মা-বাবাকে সেটার দিকে খেয়াল রাখতে হবে।’ টেলিমেডিসিন পদ্ধতিতে ঢাকার বাইরের চিকিৎসকদের পরামর্শ দিয়েও দেশব্যাপী কিডনি রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি।

দেশে কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের চিকিৎসা পদ্ধতির আরও উন্নয়ন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন চিকিৎসকেরা। তাদের মতে, কিডনি চিকিৎসার ওষুধগুলো দামি। এগুলো যদি দেশীয় কোম্পানি উৎপাদন করতে সক্ষম হয় তাহলে চিকিৎসার খরচ কমে আসবে। এছাড়া কিডনি চিকিৎসায় ৩-৪ মাস পর পর পরীক্ষা করতে হয়। এই পরীক্ষাগুলোও বেশ ব্যয়বহুল। ট্রান্সপ্লান্টের পর সারা জীবন কিডনি ঠিক রাখতে ওষুধ খেতে হয়। যদি দেশীয় কোম্পানি থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধ উৎপাদন করা যায় তাহলে খরচ আরও অনেক কমে আসবে বলে মনে করেন চিকিৎসকেরা।

এ ব্যাপারে সহকারী অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, দেশে কিডনি চিকিৎসা বা কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের খরচ ভারতের তুলনায় তিন ভাগের একভাগ, আর সিঙ্গাপুরের চেয়ে দশভাগের একভাগ এবং তা মধ্যবিত্ত পরিবারের নাগালের মধ্যে।

অধ্যাপক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘মানুষ আগের চেয়ে অনেক সচেতন। যার কারণে কিডনি রোগে শিশুমৃত্যুর হার কমছে। সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে এ রোগের বিস্তার রোধ করা এবং কিডনি রোগে আক্রান্ত শিশুদের পুরোপুরি সুস্থ জীবনযাপন সম্ভব বলে আমার বিশ্বাস।’
 

মন্তব্য করুন:

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বাধিক পঠিত