spot_img
spot_img

বুধবার, ৬ জুলাই ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯, দুপুর ১২:৩৫

সর্বশেষ
বাগমারা প্রেসক্লাবের সভাপতি ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় গ্রেফতার, দ্রুত মুক্তির দাবি মহাসড়কে দুর্ঘটনা রোধে অতিরিক্ত গতির গাড়ির বিরুদ্ধে তৎপর হাইওয়ে পুলিশ মহাসড়কে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে হেলমেট পরিধানে উদ্বুদ্ধ করছে হাইওয়ে পুলিশ খুলনায় বিএনপির মানববন্ধনে পুলিশের লাঠিচার্জ বাগেরহাটে র‌্যাবের ভেজাল বিরোধী অভিযান, তিন প্রতিষ্ঠানকে ৭৫ হাজার টাকা জরিমানা ইসলামী ব্যাংক ও পার্কভিউ হসপিটাল-এর মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক লিঃ ও বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড-এর মধ্যে ‘মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রিপেইড মিটারের বিল প্রদান’ বিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষর
প্রচ্ছদশোক বহিবারে দাও শক্তি
Array

শোক বহিবারে দাও শক্তি

হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরে খেয়েদেয়ে বিশ্রাম নিতে না নিতেই পারিবারিক আদালতে আমার বিচার শুরু হলো। প্রায় প্রতিদিনই এমনতর বিচারের মুখোমুখি হই। কখনো ছেলেমেয়েরা থাকে আমার বিচারক, আবার কখনো ওদের মা। ১২ মার্চ ২০১৮ তারিখটিতে এই বিচার চলাকালে আমার ভাতিজা প্রতীকের ফোন। ‘চাচ্চু, দেখছ নাকি কাঠমান্ডুতে ইউএস বাংলা প্লেন ক্র্যাশ করেছে।’ বিচারকর্ম পরিত্যক্ত হলো। টিভি খুলে স্ক্রল দেখতে লাগলাম। মুঠোফোনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানতে পারলাম এই দুর্ঘটনার খবর। আশা ছিল আসলে তেমন কিছুই হয়নি, রানওয়ে থেকে বিমান একটু ছিটকে পড়েছে। হয়তো যাত্রীরা ভালোই আছেন। এমন সময় আমার পুত্র পাইলটের সঙ্গে এয়ারপোর্ট কন্ট্রোল টাওয়ারের কথোপকথন জোগাড় করে শোনাতে থাকল। ছবিতে বিধ্বস্ত দুই টুকরো হওয়া বিমানের ছবিটি দেখে মাথাটা ঘুরে উঠল। বুঝলাম, ক্যাজুয়ালটি অনেক। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। আরও তথ্যের জন্য ফেসবুক স্ক্রল করতে লাগলাম। হঠাৎ বন্ধু সুমন জাহিদের একটি পোস্ট দেখে মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সে লিখেছে, আমাদের বন্ধু রফিক জামান রিমু, ওর স্ত্রী বিপাশা আর সন্তান অনিরুদ্ধ ওই বিমানে ছিল! হায়, চোখের সামনে রিমুর বিশ্লেষণধর্মী কথোপকথন, তর্কাতর্কি আর চেহারাটা ভেসে উঠল। আমি একজন পেশাদার সাইকিয়াট্রিস্ট। রোগীকে আবেগ নিয়ন্ত্রণের উপদেশ দিই, গ্রিফ ম্যানেজমেন্টের সব কৌশল আমার নখদর্পণে, সরকারি–বেসরকারি সংস্থায় ‘দুর্যোগ–পরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্যসেবা’ নিয়ে লম্বা লম্বা লেকচার দিয়ে বেড়াই, চিকিৎসক-কাউন্সেলরদের প্রশিক্ষণ দিই, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রকাশিত ‘দুর্যোগ–পরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্যসেবা’–বিষয়ক প্রকাশনায় আমার নাম যুক্ত থাকায় গর্ববোধ করি; কিন্তু বন্ধু সুমন জাহিদের পোস্ট দেখে আমার নিজের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। ঢোক গিলতে পারছিলাম না, সমানে বাসার মধ্যে পায়চারি শুরু করলাম। সুমন জাহিদকে ফোন দিলাম, নম্বরটি ব্যস্ত আছে বলে জানাল। রিমু কাজ করত প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিয়ে। ওর সঙ্গে আমার কাজের ক্ষেত্রের কিছুটা মিল থাকায় পেশাগত সভা–সেমিনারেও আমাদের দেখা হতো। তর্কটা সে ভালোই করত। ওর সঙ্গে কিছুদিন আগে আমার শেষ কথোপকথনটা মনে পড়ল। আমার এক আত্মীয়ের জন্য একটি এনজিওতে চাকরির বিষয়ে ওর সঙ্গে কথা বলেছিলাম।
আমি আর বেশিক্ষণ হাঁটাহাঁটি করতে পারলাম না। পা দুটো যেন অবশ হয়ে আসছে। বসলাম। হাতে মুঠোফোন, সমানে স্ক্রল করে যাচ্ছি। বুঝতে পারছি ভালো কোনো সংবাদ নেই। 

একজন পেশাদার সাইকিয়াট্রিস্ট হওয়ার পরও আমি আমার মনের ঝড়কে থামাতে পারছিলাম না। উপলব্ধি হলো, আমাদের যত লেকচার, ট্রেনিং, ট্রমা কাউন্সেলিং—একজন শোকগ্রস্ত মানুষের ওপর কাজ করতে পারছে না। কিন্তু এটি তো বিজ্ঞান। তাই আমি স্থির হয়ে বসে নিজেকে শান্ত করতে চাইলাম। নিজেকে স্বাভাবিক হতে হবে। শোককে মেনে নিতে হবে। নানা ধরনের খবর আসছে। কোথাও দেখলাম রিমু বিমানের ভেতর আটকে আছে, কোথাও দেখলাম ওর কোনো খোঁজ নেই, আরেকজন আশার আলো দেখাল—রিমু হাসপাতালে আহত হয়ে আছে। ক্রমে সন্ধ্যা হলো। প্রবাসী বন্ধু লিটন কাঠমান্ডু দূতাবাসের সূত্রে জানাল, সব শেষ। রিমু সপরিবারে নিহত।
আমি হয়তো আমার বন্ধুর জন্য বিচলিত। কিন্তু চিন্তা করতে থাকলাম ৫০ জনের পরিবার আর তাঁদের স্বজনদের মনের অবস্থা। এর মধ্যে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় থেকে ফোন। কাঠমান্ডুর বিমান দুর্ঘটনায় নিহত–আহত ব্যক্তিদের স্বজনদের প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দিতে একটি দল গঠন করা হয়েছে। সেখানে আমার হাসপাতালের এই বিষয়ে প্রশিক্ষিত জামাল হোসেনকে সংযুক্ত করে দিলাম। বিচলিত অবস্থাতেই পেশাগত কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। একবার মনে হলো সব মিথ্যা, কোনো দুর্ঘটনাই ঘটেনি। তারপর মনে হলো আরে এটা ‘গ্রিফ’ রি–অ্যাকশনের প্রথম ধাপ, শোককে অস্বীকার করা। মনে হলো এই ট্রমা কাউন্সেলিং, মনোসামাজিক সহায়তার বড় বড় বুলি নিছক মেকি। কী হয় এতে? সব ফালতু। পরক্ষণেই যৌক্তিক মন বলে উঠল—না, এটা বিজ্ঞান, বিজ্ঞান মিথ্যা নয়।

মন্তব্য করুন:

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বাধিক পঠিত