spot_img
spot_img

বৃহস্পতিবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২১, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, সন্ধ্যা ৬:৪৬

প্রচ্ছদ৯ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতিতে ৯ ব্যাংক
Array

৯ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতিতে ৯ ব্যাংক

ক্রমাগত খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকায় বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে দেশের ব্যাংকিং খাত। আমানতকারীদের সুরক্ষা দিতে খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হয়। কিন্তু সাতটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় অর্জিত মুনাফা দিয়েও প্রভিশন সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সর্বশেষ হিসাবে নয় ব্যাংকে নয় হাজার ৩৭৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকার প্রভিশন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। খেলাপি ঋণের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৈরি করা অক্টোবর-ডিসেম্বর ’১৭ প্রান্তিকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, প্রভিশন ঘাটতিতে পড়া নয় ব্যাংকের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংকেরই আট হাজার ২৬০ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি হয়েছে। এছাড়া অন্য ছয়টি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে প্রায় এক হাজার ১১৫ কোটি টাকা। আগের প্রান্তিক জুলাই-সেপ্টেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি খাতের সাতটি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ছিল আট হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা। সে হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংকের সংখ্যা বেড়েছে দুটি আর প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।

ব্যাংক ব্যবস্থায় ঋণের শ্রেণিমান অনুযায়ী নির্ধারিত পরিমাণ নিরাপত্তা সঞ্চিতির অর্থ সংরক্ষণের বিধান রয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখতে ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক এবং বেসরকারি খাতের বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক ও স্টান্ডার্ড ব্যাংক। এ ছাড়া নতুন করে এই ঘাটতির তালিকায় যুক্ত হয়েছে বেসরকারি খাতের ঢাকা ব্যাংক ও বিশেষায়িত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)। বিশ্লেষকদের মতে, প্রভিশন সংরক্ষণ করার মতো পর্যাপ্ত আয় ছিল না বলেই ঘাটতিতে পড়েছে এসব ব্যাংক। প্রভিশন ঘাটতি থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারে না। এতে নিরুৎসাহিত হন বিনিয়োগকারীরা। এ ছাড়া যেসব ব্যাংক প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়, তাদের মূলধন ঘাটতিতে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাদের মতে, ব্যাংক খাতে সামগ্রিক প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতির অন্যতম প্রধান কারণ খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পাওয়া। আর খেলাপি ঋণ বাড়ার মূলে রয়েছে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে সঠিকভাবে ঝুঁকি পর্যালোচনা না করা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঋণ ঝুঁকি নীতিমালার অপব্যবহারও করছে ব্যাংকগুলো। এ কারণে অস্বাভাবিক হারে খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। তারা বলেন, পরিস্থিতি উত্তরণে ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় ব্যাংকিং খাতসহ সামগ্রিক অর্থনীতিই বিপর্যয়ের মুখে পড়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণেই প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে। আর ব্যাংকগুলোকে আয়ের খাত থেকে অর্থ এনে এই প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা লভ্যাংশ বঞ্চিত হন। এ ছাড়া যেসব ব্যাংক প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে তাদের মূলধন ঘাটতিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ আমানত গ্রহণ করে তার একটি অংশ বাংলাদেশ ব্যাংকে সংরক্ষণ করতে হয়, যাকে ব্যাংকিং ভাষায় এসএলআর বলে। আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য এ অর্থ রাখা হয়। বাকি অর্থ ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করে থাকে। কিন্তু ব্যাংক যাদের কাছে বিনিয়োগ করে তারা ঋণ ফেরত না দিলে আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য খেলাপি ঋণের প্রকার ভেদে বিভিন্ন হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। আর এ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয় ব্যাংকের মুনাফা থেকে। কোনো ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি হলে ওই ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দেখা দেয়। আর মূলধন ঘাটতি হলে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী ওই ব্যাংক বছর শেষে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিতে পারে না। নীতিমালা অনুযায়ী সাধারণত কোনো ঋণ মন্দ ঋণে পরিণত হলে ওই ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। আর সন্দেহজনক খেলাপি হলে ৫০ ভাগ ও নি¤œমানের খেলাপি হলে ২০ ভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান মতে, ডিসেম্বর ’১৭ শেষে নয় ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি হয়েছে নয় হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা। ২০১৬’র ডিসেম্বর শেষে ছয় ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি হয়েছিল ছয় হাজার ৫৪০ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকের সংখ্যা বেড়েছে তিনটি আর প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ বেড়েছে দুই হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সোনালী, রূপালী ও বেসিক এই তিন ব্যাংকেরই প্রভিশন ঘাটতি হয়েছে আট হাজার ২৬০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের ঘাটতি রয়েছে সর্বোচ্চ তিন হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। একইভাবে বেসিক ব্যাংকের তিন হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা আর রূপালী ব্যাংকের এক হাজার ৮১ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে। আর বেসরকারি খাতের পাঁচটি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ব্যাংকগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ১৯৫ কোটি টাকা, ঢাকা ব্যাংকের ২৬৭ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৭৯ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের ১৬০ কোটি টাকা এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ২৭৫ কোটি টাকা প্রভিশন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া বিশেষায়িত খাতের রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি হয়েছে ১৩৮ কোটি টাকা।

পরিসংখ্যানে আরো দেখা যায়, ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে সাত লাখ ৯৮ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে খেলাপি ঋণের পাশাপাশি মন্দ ঋণও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ফলে ব্যাংকগুলো কাক্সিক্ষত হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারছে না। তবে এ সময় কয়েকটি ব্যাংক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি প্রভিশন সংরক্ষণ করায় ব্যাংক খাতে সামগ্রিক প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৭৬৭ কোটি টাকা।

মন্তব্য করুন:

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বাধিক পঠিত