spot_img
spot_img

রবিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২২, ৯ মাঘ ১৪২৮, সকাল ৬:১৭

প্রচ্ছদসু চির বিরুদ্ধে যে প্রক্রিয়ায় মামলা করা সম্ভব
Array

সু চির বিরুদ্ধে যে প্রক্রিয়ায় মামলা করা সম্ভব

অস্ট্রেলিয়ায় থাকা রোহিঙ্গারা সু চির বিরুদ্ধে মামলার উদ্যোগ নিলেও সে দেশের অ্যাটর্নি জেনারেল এক অনানুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, বিদেশে কূটনীতিকদের বিচার সংক্রান্ত আইনের আওতায় সু চি দায়মুক্তি পাবেন। তবে অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করেছেন মামলার উদ্যোগ নেওয়া আইনজীবীরা।  তারা বলছেন, সু চি ‘কূটনৈতিক দায়মুক্তি’ পাবেন কিনা তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নাই।  বিশ্বজনীন ন্যয়বিচার (ইউনিভার্সাল জুরিসডিকশন) ধারণার আওতায় সু চির বিচারের সুযোগ আছে বলে মনে করছেন তারা। এক্ষেত্রে চিলির স্বৈরশাসক অগাস্তো পিনোশেরকে নিয়ে দেওয়া ব্রিটিশ আদালতের এক সিদ্ধান্তের উদাহরণ টেনেছেন মামলার উদ্যোগ নেওয়া আইনজীবীরা। ওই আইনজীবীদের একজন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, পরবর্তী পদক্ষেপের আগে অ্যাটর্নি জেনারেলের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।

দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সংগঠন আসিয়ানের বিশেষ সম্মেলনে যোগ দিতে অস্ট্রেলিয়াতে অন্যান্যদের সঙ্গে উপস্থিত হয়েছিলেন মিয়ানমারের অং সান সু চি।  তার পৌঁছানোর পূর্বেই অস্ট্রেলীয় আইনজীবী ও অ্যাকটিভিস্টদের একটি দল মেলবোর্নের আদালতে সু চির বিরুদ্ধে মামলার উদ্যোগ নেন। সু চির বিরুদ্ধে দাখিল করা অভিযোগের বর্ণনার বড় অংশই প্রস্তুত করেছেন ‘হিউম্যান রাইটস ফর অলের’ প্রধান পরিচালক অ্যালিসন ব্যাটিসন। তিনি জানিয়েছেন মেলবোর্নের রন মার্কেল কিউসি, দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ফেডারেল কোর্টের সাবেক বিচারক ম্যারিওন ইসাবেল এবং কমনওয়েলথ আইন বিশেষজ্ঞ রাইলেনে সার্পের মতো তিনজন আইন বিশেষজ্ঞ তাদের সঙ্গে কাজ করছেন। দলের অপর সদস্য সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষার্থী নিনা ডিলন ব্রিটন।

মামলা দায়ের করার প্রথম উদ্যোগ নিয়েছিল অস্ট্রেলিয়াতে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আগে থেকেই কাজ করা সিডনিভিত্তিক আইনজীবী ড্যানিয়েল টেইলর ব্যাটিসনকে এ বিষয়ে কাজ করার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। অভিযোগে কোনও রোহিঙ্গার নাম না থাকার প্রসঙ্গে ব্যাটিসন মার্কিন সংবাদমাধ্যম ভাইস নিউজকে বলেছেন, ‘অভিযোগে কোনও রোহিঙ্গার নাম থাকলে পরবর্তীতে তাদের বা তাদের পরিবারের ওপর প্রতিশোধ নেওয়া হতে পারে, এই ভয়ে রোহিঙ্গাদের কেউ নাম প্রকাশ করতে চাননি।’ ব্যাটিসন মনে করেন, সফল হলে এই মামলাটি অস্ট্রেলিয়া ও পুরো বিশ্বের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।

সু চির বিরুদ্ধে তারা যে আর্জি দাখিল করেছিলেন তাতে অভিযোগ করা হয়েছে, সু চি রোহিঙ্গাদের বলপূর্বক দেশ ছাড়া করার জন্য দায়ী।  আর্জিটির বক্তব্যটি ব্যাখ্যা করতে ব্যাটিসন জানিয়েছেন, ‘আমরা মূলত বলতে চেয়েছি, মিয়ানমারের সরকার ও সেনাবাহিনীর যারা এই অত্যাচারের সঙ্গে জড়িত তাদের নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়ে সু চির হাতে কার্যকর ক্ষমতা রয়েছে। অস্ট্রেলিয়াতে এটা আগে কখনও করা হয়নি। তবে রোম চুক্তির বিষয়ে অস্ট্রেলিয়াতে আইন আছে, এবং এটা সেরকমই একটি বিষয় যেসব বিষয় ফয়সালা করার জন্য ওই আইনটি করা হয়েছে।’

আইনজীবীরা গত শুক্রবার মেলবোর্নের আদালতে মামলা দায়ের করার পাশাপাশি আর্জিটির একটি অনুলিপি অস্ট্রেলিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে পাঠিয়েছিলেন। অ্যাটর্নি জেনারেল ক্রিশ্চিয়ান পোর্টার সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়াতে তিনি সু চির বিচারের কোনও উদ্যোগকে সমর্থন করা সম্ভব নয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে তিনি বলেছেন, পূর্ণাঙ্গ দায়মুক্তির আওতায় রয়েছেন সু চি। এমনকী আদালতের নথির ভিত্তিতেও তার বিরুদ্ধে কোনও কিছু করার সুযোগ নাই। কারণ কাস্টমারি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক বিচারের আওতামুক্ত। তাদের গ্রেফতার, আটকসহ কোনও ধরনের বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় নেওয়ার সুযোগ নাই।  ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকেও একই কথা জানান তিনি।

ব্যাটিসনকে মামলার নথি তৈরিতে সহায়তাকারী ইউনিভার্সিটি অফ সিডনির আইনের ছাত্রী নিনা ডিলন ব্রিটনের ভাষ্য, ‘অ্যাটর্নি জেনারেল মনে করেন, সু চির কূটনৈতিক দায়মুক্তি রয়েছে এবং সে কারণে তার বিচারের আবেদনে তিনি সম্মতি দেবেন না। কিন্তু কূটনৈতিক দায়মুক্তির বিষয়টি প্রশ্নসাপেক্ষ। কূটনৈতিক দায়মুক্তি তার জন্য প্রযোজ্য নাও হতে পারে। মিয়ানমারের সরকার চলছে সু চি ও সেনাবাহিনীর মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে। সু চি কার্যত রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়ার বিষয়টি ঠেকানোর বিষয়টি দেখভাল করছেন এবং রোহিঙ্গাদের বিদেশি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে গণহত্যার কাজটি জায়েজ করার পটভূমি নিশ্চিত করে দিচ্ছেন।’

সু চির বিরুদ্ধে মামলা করার আগে ব্যাটিসন ও তার সহযোগীরা কয়েকটি বিষয়ে প্রস্তুতি নিয়েছেন। যেমন রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যে সহিংসতা হয়েছে তা কতটা ব্যাপক মাত্রার ছিল, সহিংসতা সাধারণ জনগণের ওপর হয়েছিল কি না, রোহিঙ্গারা আইনানুগভাবে ওই স্থানের বাসিন্দা কি না, তাদেরকে কিভাবে স্থানান্তর করা হয়েছে ইত্যাদি। অ্যাটর্নি জেনারেল পোর্টারের মন্তব্য আইনি কার্যক্রম চালিয়ে যাতে কোনও প্রভাব ফেলবে না জানিয়ে ব্যাটিসন বলেছেন, ‘অ্যাটর্নি জেনারেল যদি সরাসরি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন তাহলেই  আমাদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হতো। আমারা এখনও তার কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়ার অপেক্ষায় আছি।’ যুক্তরাজ্যের অগাস্তো পিনোশের মামলার উদাহরণ টেনে তিনি বলেছেন, সেখানকার আদালত কিন্তু মানবতাবিরোধী অপরাধে তার বিচারের আদেশই দিয়েছিল।’

চিলিতে গণহত্যা চালানোর দায়ে অভিযুক্ত পিনোশের গ্রেফতার কার্যকর করাতে অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও আইনজীবী গ্রেস ‘বিশ্বজনীন ন্যায়’ ধারণার বলেই উদ্যোগ নিয়েছিল। স্পেনের আদালত ‘ইউনিভার্সাল জুরিসডিকশন’ নীতির বলেই চিলিত সংগঠিত অপরাধের জন্য চিলির স্বৈরশাসক পিনোশেকে গ্রেফতারের আদেশ দিয়েছিল, যা কার্যকর করেছিল যুক্তরাজ্য। পরবর্তীতে মানসিক স্বাস্থ্যের কারণ দেখিয়ে রাজনৈতিক চাপে পড়া যুক্তরাজ্য সরকার পিনোশেকে মুক্ত করে দিলেও তার গ্রেফতারির মাধ্যম এটা প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিল, স্পেন এবং যুক্তরাজ্যের আইনে বিশ্বজনীন ন্যায়বিচার নীতির বলে সাবেক রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানকেও বিচারের আওতায় আনা যায়।

বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকায় এ নিয়ে বিস্তারিত বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ব্যাটিসন। তবে রয়টার্সকে তিনি বলেছেন, এই মামলাটির সম্ভাবনা থাকার কারণেই তারা উদ্যোগ নিয়েছেন। এক্ষেত্রে বিশ্বজনীন ন্যয়বিচারের ধারণায় সু চিকে বিচারের আওতায় নেওয় সম্ভব বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। বিশ্বজনীন ন্যয়বিচারের ধারণায় মনে করা হয়, এই ধরণের অপরাধগুলোর গুরুত্ব এত বেশি যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সবারই এ বিষয়ে নজর দেওয়ার দরকার। এ ধরণের অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত হওয়াটাই কাম্য এবং দোষীদের বিচার ও শাস্তি বিধান হওয়া দরকার। এসব অপরাধের বিষয়ে কোন দায়মুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কূটনৈতিক দায়মুক্তি প্রসঙ্গে বলেছিল, ‘কিছু কিছু অপরাধ পুরো বিশ্ববাসীর জন্যই এমন হুমকি তৈরি করে যে সেসব অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা দেশগুলোর যৌক্তিক ও নৈতিক দায়িত্ব: গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, যুদ্ধাপরাধ, নির্যাতন এবং গুমের মতো অপরাধের সঙ্গে যারা জড়িত, কোনও দেশ তাদের জন্য নিরাপদ স্থান হতে পারে না।’

জাতিসংঘে নিযুক্ত দেশটির স্থায়ী প্রতিনিধির ২০১৬ সালের ৩ মে তারিখে দেওয়া প্রতিবেদনে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান ব্যাখ্যা করে জানানো হয়েছে, ‘অপরাধ যেখানেই সংগঠিত হয়ে থাকুক না কেন বিশ্বজনীন ন্যায়বিচারের (ইউনিভার্সাল জুরিসডিকশন) ধারণার বলে সব দেশেরই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরে আসা কিছু চরম ঘৃণ্য অপরাধের শাস্তি বিধানের উদ্যোগ নেওয়ার অধিকার আছে।…গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ, দাস ব্যবসা এবং নির্যাতনের মত অপরাধ এই ‘বিশ্বজনীন ন্যায়বিচারের’ ধারণার আওতাভুক্ত।  অস্ট্রেলিয়া জাতিসংঘকে দেশটির আইনের সঙ্গে বিশ্বজনীন ন্যায়ের ধারণার সমন্বয় সাধন প্রসঙ্গে বলেছে, ‘দেশিয় আইনে কার্যকর করার জন্য আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতাগুলোকে অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় আইনের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার সংসদ নিশ্চিত করেছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উৎকণ্ঠার কারণ হওয়া গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ, জলদস্যুতা, দাস ব্যবসা, নির্যাতন এবং এসব অপরাধ সংগঠনের চেষ্টা করা, উস্কানি দেওয়া ও অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের সাহায্য করার মতো অপরাধগুলো যে শাস্তিযোগ্য অপরাধ তা অস্ট্রেলিয়ার আইনে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার আইনে এটাও বর্ণিত হয়েছে, বিশ্বজনীন ন্যাবিচার ধারণার বলে ওইসব অপরাধের তদন্ত ও বিচার করার আইনি এখতিয়ার অস্ট্রেলিয়ার রয়েছে।

মন্তব্য করুন:

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বাধিক পঠিত