spot_img
spot_img

সোমবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২১, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, রাত ১১:৪৭

প্রচ্ছদএলার্জিজনিত রোগ ও চিকিৎসা
Array

এলার্জিজনিত রোগ ও চিকিৎসা

এলার্জি বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষের কাছে এক অসহনীয় ব্যাধি। এলার্জিতে হাঁচি থেকে শুরু করে খাদ্য ও ওষুধের ভীষণ প্রতিক্রিয়া ও শ্বাসকষ্ট হতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে এলার্জি সামান্যতম অসুবিধা করে আবার কারও ক্ষেত্রে জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। ঘরের ধুলাবালি পরিষ্কার করছেন? হঠাৎ করে হাঁচি এবং পরে শ্বাসকষ্ট অথবা ফুলের গন্ধ নিচ্ছেন বা গরুর মাংস, চিংড়ি, ইলিশ, গরুর দুধ খেলেই শুরু হলো গা চুলকানি বা চামড়ায় লাল লাল চাকা হয়ে ফুলে ওঠা। এগুলো হলে আপনার এলার্জি আছে ধরে নিতে হবে। 

এলার্জি কী? কেন হয় এবং কী করেই বা এড়ানো যায়? তা নিয়ে কিছু আলোচনা করা যাক।
প্রত্যেক মানুষের শরীরে এক একটি প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম থাকে, কোন কারণে এ ইমিউন সিস্টেমে গোলযোগ দেখা দিলে তখনই এলার্জির বহির্প্রকাশ ঘটে।

০ এলার্জি
আমাদের শরীর সব সময়ই ক্ষতিকর বস্তুকে (পরজীবী, ছত্রাক, ভাইরাস, এবং ব্যাকটেরিয়া) প্রতিরোধের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধের চেষ্টা করে। এই প্রচেষ্টাকে রোগ প্রতিরোগ প্রক্রিয়া বা ইমিউন বলে। কিন্তু কখনও কখনও আমাদের শরীর সাধারণত ক্ষতিকর নয় এমন অনেক ধরনের বস্তুকেও ক্ষতিকর ভেবে প্রতিরোধের চেষ্টা করে। সাধারণত ক্ষতিকর নয় এমন সব বস্তুর প্রতি শরীরের এ অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াকে এলার্জি বলা হয়। 
০ এলার্জিজনিত প্রধান সমস্যাগুলো?
০ এলার্জিজনিত সর্দি বা এলার্জিক রাইনাইটিস
এর উপসর্গ হচ্ছে অনবরত হাঁচি, নাক চুলকানো, নাক দিয়ে পানি পড়া বা নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, কারও কারও চোখ দিয়েও পানি পড়ে এবং চোখ লাল হয়ে যায়। 
০ এলার্জিক রাইনাইটিস দুই ধরনের
০ সিজনাল এলার্জিক রাইনাটিস : বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে এলার্জিক রাইনাইটিস হলে একে সিজনাল এলার্জিক রাইনাইটিস বলা হয়। 
০ পেরিনিয়াল এলার্জিক রাইনাইটিস : সারা বছর ধরে এলার্জিক রাইনাইটিস হলে একে পেরিনিয়াল এলার্জিক রাইনাইটিস বলা হয়। 
০ লক্ষণ ও উপসর্গ
০ সিজনাল এলার্জিক রাইনাইটিস :
০ ঘন ঘন হাঁচি
০ নাক দিয়ে পানি পড়া
০ নাসারন্ধ্র বন্ধ হয়ে যাওয়া 
০ এছাড়াও অন্যান্য উপসর্গগুলো
০ চোখ দিয়ে পানি পড়া
০ চোখে তীব্র ব্যথা অনুভব করা
০ পেরিনিয়াল এলার্জিক রাইনাইটিস :

পেরিনিয়াল এলার্জিক রাইনাইটিসের উপসর্গগুলো সিজনাল এলার্জিক রাইনাইটিসের মতো। কিন্তু এক্ষেত্রে উপসর্গগুলোর তীব্রতা কম হয় এবং স্থায়িত্ব বেশি হয়।
০ এজমা বা হাঁপানি :
এর উপসর্গ হচ্ছে কাশি, ঘন ঘন শ্বাসের সহিত বাঁশির মতো শব্দ হওয়া বা বুকে চাপ লাগা, বাচ্চাদের ক্ষেত্রে মাঝে মধ্যেই ঠাণ্ডা লাগা। 
০ এজমা রোগের প্রধান প্রধান উপসর্গ বা লক্ষণগুলো হলো-
০ বুকের ভেতর বাঁশির মতো সাঁই সাঁই আওয়াজ
০ শ্বাস নিতে ও ছাড়তে কষ্ট
০ দম খাটো অর্থাৎ ফুসফুস ভরে দম নিতে না পারা 
০ ঘন ঘন কাঁশি
০ বুকে আঁটসাঁট বা দম বন্ধভাব
০ রাতে ঘুম থেকে ওঠে বসে থাকা
০ আর্টিকেরিয়া :
আর্টিকেরিয়ার ফলে ত্বকে লালচে ফোলা ফোলা হয় এবং ভীষণ চুলকায়। ত্বকের গভীর স্তরে হলে, মুখ, হাত-পা ফুলে যেতে পারে। আর্টিকেরিয়ার ফলে সৃষ্টি খোলা অংশগুলো মাত্র কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী থাকে কিন্তু কখনও কখনও বার বার হয়। যে কোনো বয়সে আর্টিকেরিয়া হতে পারে। তবে স্বল্পস্থায়ী আর্টিকেরিয়া বাচ্চাদের মধ্যে এবং দীর্ঘস্থায়ী আর্টিকেরিয়া বড়দের মধ্যে দেখা যায়।
০ সংস্পর্শজনিত এলার্জিক ত্বক প্রদাহ/এলার্জিক কনটাক্ট ডারমাটাইটিস :
চামড়ার কোথাও কোথাও শুকনো, খসখসে, ছোট ছোট দানার মতো ওঠা। বহিস্থ উপাদান বা এলার্জেনের সংস্পর্শে ত্বকে প্রদাহ হলে তাকে এলার্জিক কনটাক্ট ডারমাটাইটিস বলা হয়।
০ লক্ষণ ও উপসর্গ
০ ত্বকে ছোট ছোট ফোঁসকা পড়া 
০ ফোঁসকাগুলো ভেঙে যাওয়া
০ চুয়ে চুয়ে পানি পড়া 
০ ত্বকের বহিরাবরণ ওঠে যাওয়া
০ ত্বক লালচে হওয়া এবং চুলকানো 
০ চামড়া ফেটে আঁশটে হওয়া
০ একজিমা :
একজিমা বংশগত চর্মরোগ যার ফলে ত্বক শুষ্ক হয়, চুলকায়, আঁশটে এবং লালচে হয়। খোঁচানোর ফলে ত্বক পুরু হয় ও কখনও কখনও ওঠে যায়। এর ফলে ত্বক জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত ত্বক থেকে চুয়ে চুয়ে পানি পড়ে এবং দেখতে ব্রুণ আক্রান্ত বলে মনে হয়। এটা সচরাচর বাচ্চাদের মুখে ও ঘাড়ে এবং হাত ও পায়ে বেশি দেখা যায়। 
০ এলার্জিক কনজাংটিভাইটিস :
চোখে চুলকানো, চোখ লাল হয়ে যাওয়া
০ খাওয়ায় এলার্জি :
উপসর্গ পেটে ব্যথা, বমি বমিভাব, বমি হওয়া এবং ডায়রিয়া। 
০ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া জনিত এলার্জি :
এটা খুবই মারাত্মক। এলারজেন শরীরের সংস্পর্শে আসার সঙ্গে সঙ্গে এটা শুরু হয়ে যেতে পারে। নিম্ন উল্লিখিত উপসর্গগুলো হতে পারে। 
০ চামড়া লাল হয়ে ফুলে ওঠে, চুলকায়
০ শ্বাসকষ্ট, নিশ্বাসের সঙ্গে বাঁশির মতো আওয়াজ
০ মূর্ছা যেতে পারে
০ রক্তচাপ কমে গিয়ে রোগী সকে চলে যেতে পারে। 
০ সাধারণ এলার্জি উৎপাদকগুলো :
০ মাইট 
০ মোল্ড 
০ ফুলের রেণু বা পরাগ
০ ঠাণ্ডা এবং শুষ্ক আবহাওয়া 
০ খাদ্যদ্রব্য
০ ঘরের ধুলো ময়লা 
০ প্রাণীর পশম এবং চুল
০ পোকা মাকড়ের কামড় 
০ ওষুধসহ কিছু রাসায়নিক দ্রব্যাদি
০ প্রসাধন সামগ্রী 
০ উগ্র সুগন্ধী বা তীব্র দুর্গন্ধ
০ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা :
০ রক্ত পরীক্ষা বিশেষত : রক্তে ইয়োসিনোফিলের মাত্রা বেশি আছে কিনা, তা দেখা। 
০ সিরাম আইজিইর মাত্রা : সাধারণত এলার্জি রোগীদের ক্ষেত্রে আইজিইর মাত্রা বেশি থাকে।
০ স্কিন প্র্রিক টেস্ট : এ পরীক্ষায় রোগীর চামড়ার ওপর বিভিন্ন এলার্জেন দিয়ে পরীক্ষা করা হয় এবং এ পরীক্ষাতে কোন কোন জিনিসে রোগীর এলার্জি আছে তা ধরা পড়ে। 
০ প্যাচ টেস্ট : এ পরীক্ষায় রোগীর ত্বকের ওপর
০ বুকের এক্স-রে : হাঁপানি রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসা শুরু করার আগে অবশ্যই বুকের এক্স-রে করে দেখা দরকার যে অন্য কোনো কারণে শ্বাসকষ্ট হচ্ছে কিনা। 
০ স্পাইরোমেট্রি বা ফুসফুসের ক্ষমতা দেখা : এ পরীক্ষা করে রোগীর ফুসফুসের অবস্থা সম্পর্কে সঠিক ধারণা করা যায়।
০ সমন্বিতভাবে এলার্জির চিকিৎসা হলো : 
০ এলার্জেন পরিহার : যখন এলার্জির সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায়, তখন তা পরিহার করে চললেই সহজ উপায়ে এলার্জি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
০ ওষুধ প্রয়োগ : এলার্জি ভেদে ওষুধ প্রয়োগ করে এলার্জি উপশম অনেকটা পাওয়া যায়।
০ এলার্জি ভ্যাকসিন বা ইমুনোথেরাপি : এলার্জি দ্রব্যাদি থেকে এড়িয়ে চলা ও ওষুধের পাশাপাশি ভ্যাকসিনও এলার্জিজনিত রোগীদের সুস্থ থাকার অন্যতম চিকিৎসা পদ্ধতি। এ পদ্ধতি ব্যবহারে কর্টিকোস্টেরয়েডের ব্যবহার অনেক কমে যায়। ফলে কর্টিকোস্টেরয়েডের বহুল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে রেহাই পাওয়া যায়। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে এ পদ্ধতিতে চিকিৎসা দেয়া হয়ে থাকে। বর্তমান বিশ্বস্বাস্থ্যও এ ভ্যাকসিন পদ্ধতির চিকিৎসাকে এলার্জিজনিত রোগের অন্যতম চিকিৎসা বলে অভিহিত করে। এটাই এলার্জি রোগীদের দীর্ঘমেয়াদী সুস্থ থাকার একমাত্র চিকিৎসা পদ্ধতি। 
আগে ধারণা ছিল এলার্জি একবার হলে আর সারে না। কিন্তু বর্তমানে চিকিৎসা ব্যবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। প্রথমদিকে ধরা পড়লে এলার্জিজনিত রোগ একেবারে সারিয়ে তোলা সম্ভব। অবহেলা করলে এবং রোগ অনেক দিন ধরে চলতে থাকলে নিরাময় করা কঠিন হয়ে পড়ে।

মন্তব্য করুন:

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বাধিক পঠিত